জেনেভায় শেখ হাসিনা: ‘বাংলাদেশ সাংবিধানিক সংকটে, জনগণের স্বাধীন সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হোক ভবিষ্যৎ’
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুতর সাংবিধানিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, নির্বিচার আটক, বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ তুলে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র দেশের জনগণের।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) সুইজারল্যান্ডের জেনেভা প্রেস ক্লাবে ‘বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট: শিক্ষার অধিকার, নির্বিচার আটক ও বানোয়াট ট্রাইব্যুনাল রায়’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে মূল বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। কানাডা ও যুক্তরাজ্য ভিত্তিক গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্টস এবং তুমুকু উন্নয়ন ও সাংস্কৃতিক ইউনিয়নের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষার অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়।
বক্তব্যের শুরুতে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকটের এমন সময়ে জেনেভায় আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিনিধিদের একত্রিত করার উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, সংবিধান কেবল একটি আইনগত দলিল নয়; এটি নাগরিককে নির্বিচার ক্ষমতা থেকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, আইনের চোখে সমতা নিশ্চিত করে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে ভয়ভীতি, কারাবন্দিত্ব কিংবা প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাধানের নিশ্চয়তা দেয়।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের মানুষের জন্য শান্তি বা সমৃদ্ধি বয়ে আনেনি। তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন, এর প্রভাব এখনো দেশের সাধারণ মানুষকে ভোগ করতে হচ্ছে। তাঁর দাবি, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব মৌলিক নীতি গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে পাঁচ বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সহিংসতা, জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। গাজীপুর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এসব ঘটনা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলো পরিস্থিতির সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না; এর বাইরেও অনেক ঘটনা থেকে যায়, যেগুলো প্রকাশ্যে আসে না। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী, খাল, জলাভূমি ও সড়কের পাশে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা এবং চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলের অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে। শেখ হাসিনার ভাষায়, এটি কেবল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে আইন, জননিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের প্রশ্নও জড়িত।
বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শিক্ষানুরাগী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বা সনদ বাতিল করা হয়েছে এবং তরুণদের চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়কে কখনোই সামষ্টিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। কোনো শিক্ষার্থী অপরাধ করলে ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে আইনের আওতায় এনে জবাবদিহির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে একজন তরুণের শিক্ষা, যোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করা ন্যায়বিচার বা গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা, বিতর্ক ও স্বাধীন চিন্তার ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করে তিনি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে বিচার করার আহ্বান জানান।
কারাগারে আটক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের বিষয়েও বক্তব্য দেন এশিয়ার লৌহ মানবী খ্যাত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, তাঁর দলের হাজারো নেতা-কর্মী ও সমর্থক আটক রয়েছেন, বিভিন্ন মামলার মুখোমুখি হয়েছেন অথবা আত্মগোপনে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সন্ত্রাস বিরোধী আইনসহ বিভিন্ন ফৌজদারি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, সমান আচরণ এবং বিচারব্যবস্থার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, কোনো নাগরিক যদি মনে করেন যে আইনের সুরক্ষা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করছে, তাহলে সেটি শুধু কোনো একটি দলের জন্য নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যই উদ্বেগের বিষয়।
বাংলাদেশের বর্তমান বিচারব্যবস্থা ও চলমান ট্রাইব্যুনাল কার্যক্রম নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার উদ্দেশ্যে বিচারিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাধীনতা, আসামিপক্ষের অধিকার এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, রাষ্ট্রের হাতে একজন মানুষের জীবন নেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, বিচারিক প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তাহলে ক্ষতি কোনো একটি মামলা বা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর ফলে বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়েও বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি এবং মুক্তিযুদ্ধে দলটির ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, দলটির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার চেষ্টা চলছে। শেখ হাসিনার দাবি, কোনো বড় রাজনৈতিক দল এবং সেই দলের সমর্থক নাগরিকদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হলে সেই নির্বাচন প্রকৃত অর্থে প্রতিনিধিত্বশীল হবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জনগণকেই নির্ধারণ করতে হবে—ভয়, শক্তি প্রয়োগ কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নয়; বরং জনগণের স্বাধীন ও অবহিত মতের ভিত্তিতে।
জেনেভা থেকে জাতিসংঘ, গণতান্ত্রিক সরকার, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী সমাজ এবং বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি দেশের পরিস্থিতির ওপর নজর দেওয়ার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি নির্বিচার আটক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিপীড়ন বন্ধ, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং বিশ্বাসযোগ্য আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত না করার এবং রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের যথাযথ সুরক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্যে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে জনগণ নিজেরাই নির্ধারণ করতে পারবেন কে তাদের শাসন করবে। নিজের রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাঁর বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মা, তিন ভাই, দুই ভাবি ও অন্যান্য স্বজনকে হারিয়েছেন। দীর্ঘ সময় তাঁকে নির্বাসনে থাকতে হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। কারাবন্দিত্ব এবং তাঁর জীবনের ওপর একাধিক হামলার চেষ্টার কথাও তুলে ধরেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে একটি বিষয় শিখিয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিহিংসার ওপর কোনো জাতি তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের বাংলাদেশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন একটি রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন যেখানে মানুষ মর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে এবং আইন দুর্বল ও শক্তিশালী—সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে শেখ হাসিনা তাঁর প্রত্যাশিত বাংলাদেশের একটি চিত্র তুলে ধরেন। তিনি এমন একটি বাংলাদেশের কথা বলেন, যেখানে একজন প্রবীণ নারী গ্রেপ্তারের ভয় ছাড়াই আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন; একজন মা বিপদের আগেই রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাবেন; অপরাধী রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আসবে; কোনো শিক্ষার্থী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ভবিষ্যৎ হারাবে না এবং কারাবন্দী প্রত্যেক ব্যক্তি যথাযথ চিকিৎসা ও আইনি সুরক্ষা পাবেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বিশ্বাস যা-ই হোক, প্রত্যেক নাগরিকের আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, এটিই সংবিধানের প্রতিশ্রুত বাংলাদেশ এবং যে বাংলাদেশের জন্য দেশের মানুষ দীর্ঘদিন সংগ্রাম ও ত্যাগ করেছে, সেই বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার করাই লক্ষ্য হওয়া উচিত।
জেনেভা প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত আন্তজার্তিক এ সেমিনারে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক গবেষক, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নেন। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন বেলজিয়ামের সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য পাওলো কাসাকা, সুইডেনের আইনজীবী মোনা হাগো স্ট্রিন্ডবার্গ, জার্মানির দক্ষিণ এশিয়া গণতন্ত্র ফোরামের গবেষণা পরিচালক ড. সিগফ্রিড ও. উলফ, জাপানের মানবাধিকার কর্মী শুনিচি ফুজিকি এবং ক্যামেরুনের মানবাধিকার ও শান্তি অধিকার বিষয়ক সংগঠনের সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী ড. চংসী আইয়াচ জোসেফ। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্য দেন গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নমেন্টসের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত। সঞ্চালনা করেন মানবাধিকারকর্মী ও জেনেভা প্রেস ক্লাবের সদস্য রহমান মামুন।




































