মঙ্গলবার , ০৪ আগস্ট ২০২৬
Tuesday , 04 August 2026
২০২৬৭ ২০২৬৩ ২০২৬১

ডেস্ক নিউজ

প্রকাশিত: ১৩:২৭, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মুখে বিরোধিতা, কিন্তু ইশতেহার ভারতীয়করণ জামায়াতের

মুখে বিরোধিতা, কিন্তু ইশতেহার ভারতীয়করণ জামায়াতের

চাকুরিজীবী নারীদের সঙ্গে পতিতাদের তুলনা টেনে বেশ বেকায়দায় জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। নির্বাচনে পরাজয় নিশ্চিত বুঝেই তারা এখন নারীদের মন জয়ে নানারকম ভণিতার আশ্রয় নিচ্ছে। নির্বাচনের মুখে তুলে ধরতে চাইছে নিজেদেরউদার দৃষ্টিভঙ্গি তাই এতোকাল ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের বিষ ছড়ালেও এখন জামায়াতের ইশতেহারে ভারতের সঙ্গেও সুসম্পর্কের কথা বলা হচ্ছে। প্রচার পত্রে উঠে আসছে ভারতীয় নারীদের ছবি। কট্টর মৌলবাদী দলটির মুখে শোনা যাচ্ছে সম্প্রীতির কথাও। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচনের আগে ডাক দিয়েছেন,‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ।

জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার ভরা ভারতীয় স্থিরচিত্রে। শুধু ভারতের অভ্যন্তরেরই নয়, ভারতীয় চিত্রগ্রাহকদের তোলা বিভিন্ন ছবি ব্যবহৃত হয়েছে জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে। তাই জামায়াতেরভারত-প্রেমরাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অবাক করেছে। কারণ চিরকালই অন্ধ ভারত বিরোধিতা হচ্ছে জামায়াতের ঘোষিত নীতি। কিন্তু এবার ভোটের মুখে তারা প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে হঠাৎ করে কেন একাত্ম হতে চাইছে, সেই প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করেন, পুরোটাই ভন্ডামি। নির্বাচনী পরাজয়ের গন্ধ তাদের দিশেহারা করে তুলেছে। তাদের আরও বিপাকে ফেলছে নিজেদের বিতর্কিত মন্তব্য। নারীরা ক্ষোভে ফুঁসছেন।  এই অবস্থায় ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে আরও বিপদ ডেকে আনছেন তারা।

নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান ভারত প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘প্রতিবেশী এবং নিকটবর্তী দেশগুলির সঙ্গে শান্তিপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে। সেই তালিকায় থাকবে ভারত, ভুটান, নেপাল, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা, মলদ্বীপ এবং থাইল্যান্ড এখানেই থেমে না থেকে পরবর্তীতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের প্রতিবেশীকে সম্মান করতে চাই এবং একইভাবে প্রতিবেশীর কাছ থেকেও সম্মান প্রত্যাশা করি।আগেও অবশ্য পশ্চিমাদের দেশে গিয়ে ভারত সম্পর্কে ভালো ভালো কথা তার বলেছিলেন।  তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের চেয়ে ভারত আয়তনে ২৬ গুণ বড়। তাদের সম্পদ জনশক্তি আমাদের তুলনায় অনেক বেশি। আমরা তাদের অবস্থান বিবেচনায় সম্মান করি। তবে আমাদের ছোট ভূখণ্ড প্রায় ১৮ কোটি মানুষের অস্তিত্বকেও তাদের সম্মান করতে হবে- ‘দিস ইজ আওয়ার ডিমান্ড।যদি তা হয়, তাহলে দুই প্রতিবেশী শুধু ভালোই থাকব না, বরং এক প্রতিবেশীর কারণে অন্য প্রতিবেশীও বিশ্ব দরবারে সম্মানিত হবে।

কিন্তু এসবই তার মুখের কথা। অন্ধ ভারত বিরোধিতার পথ ছাড়েনি জামায়াত। তাই তাদের দোসর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনও প্রকাশ্যে চালিয়ে যাচ্ছে অন্ধ ভারত বিরোধিতা। জামায়াতের ইশতেহারে এবার  নারীদের শাড়ি, সালওয়ার-কামিজ পরা ছবি উপস্থাপন করা হয়েছে। ধুতি পরা ঢোল-তবলাসহ পুরুষ এবং আদিবাসীদেরও দেখা গিয়েছে।  নানা ধর্মের মানুষের ছবি দিয়েও সাজানো হয়েছে প্রচার পুস্তিকাটি। বাংলাদেশের মানচিত্রের ভেতর নানা ধর্ম সংস্কৃতির বিষয়টি কোলাজ করা হয়েছে ভারতীয়দের ছবি দিয়ে।  মুখে ভারত বিরোধিতা করলেও জামায়াতের ইশতেহারে কিন্তুশস্যশ্যামলাভারতের ছবি প্রকট রূপে ফুটে উঠেছে। জামায়াতের এইভারত-প্রীতিকিন্তু অনেকের কাছেই বেশ রহস্যজনক।

জামায়াত বলেছে, ‘সত্য ইসলামি আলোকে জীবন রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিচালিত হবে কিছুদিন আগেই জামায়াতের আমির বলেছিলেন, কর্মরত নারীরা পতিতাদের সমান। তাদের এক নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকেবেশ্যাখানাবলে ছিলেন। 

অথচ, ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকাশিত ইশতেহারে সেই জামায়াতেরই নারীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন অবশ্যই ভন্ডামির নির্লজ্জ নজির। ডা. শফিকুর জানান, ইশতেহারে নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরির অঙ্গীকার করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, মা-বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি প্রয়োজনে নিজের জীবন দিতেও প্রস্তুত আছেন।

সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথাও এখন শোনা যাচ্ছে জামায়াত নেতাদের কন্ঠে। বাংলাদেশ জুড়ে সংখ্যালঘুদের ওপর সন্ত্রাস চালানো হলেও ডা. শফিকুর এখন নির্বাচনের মুখে সম্প্রীতির বার্তা দিচ্ছেন। তাদের মুখের কথার সঙ্গে অবশ্য তাদের কাজের কোনও মিল নেই। তিনি বলছেন, ‘কে তুলসীপাতায় ধোয়া, কে দুধে ধোয়া, টান দিলে সকলের গা থেকেই দুর্গন্ধ বের হবে। এখন আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান যারা আছি, তারা একই বাগানের ভিন্ন ভিন্ন ফুলের গাছ। সবাই মিলেই আমরা ফুলের বাগান। ধর্মের ভিত্তিতে কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।অথচ তার দলের কর্মী-সমর্থকরাই গায়ের জোরে ধর্মান্তকরণে বাধ্য করছে। শিশু কিশোরীরাও শিকার হচ্ছে গণধর্ষণের।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন জামায়াত নেতারা।  এখন খোদ জামায়াতের আমিরের মুখে শোনা যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রশস্তি। এমনকী, একাত্তরের ভুল স্বীকারের কথা বলছেন তারা। নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য নিজেদের পরিচিত মিত্রশক্তি পাকিস্তান চীনের নাম পর্যন্ত তারা উল্লেখ করেনি ইশতেহারে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে ভুল বোঝাতে চাইছেন ডা. শফিকুর রহমানরা। তাই তিনি এখন বলছেন, ‘৪৭ না হলে ৭১ হতো না,৭১ না হলে ২৪ পেতাম না। একটি অপরটির সঙ্গে সম্পর্কিত। ইশতেহার কেবল দলীয় কর্মসূচি না, বরং জাতির প্রতি দলের পরিকল্পপনা; এটি একটি জীবন্ত দলিল।

তবু জামায়াতের পরাজয়ের ভয় কাটছে না। জনসমর্থন কমতে থাকায় পরাজয়ের ভয় দিশেহারা করে দিয়েছে জামায়াতকে। তাদের নির্বাচনী দোসর এনসিপিতেও শুরু হয়েছে জামায়াত বিরোধিতা। সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, নতুন দল হিসেবে এনসিপির কৌশলের অভাব রয়েছে। তাঁর ধারণা, ‘জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা যে জোটের সঙ্গী এনসিপি; সেই জোটে আধিপত্য বিস্তার করবে জামায়াতই তৃণমূলস্তরে জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির সঙ্ঘর্ষও শুরু হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়।

ইসলামপন্থীদের মধ্যেও জামায়াতকে নিয়ে সংশয় বাড়ছে। মুখে শরিয়ার কথা বললেও জামায়াতের ইসলাম বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির (চরমোনাইর পীর) সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেছেন, ‘ইশতেহারে আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছি, শরিয়তকে প্রাধান্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করা হবে। জামায়াত কিন্তু কোথাও ইসলামের কথা বলেনি। এরপরও কেউ যদি জামায়াত ইসলামকে ইসলামী দল বলে; আমি বলব, তারা বোকার স্বর্গে বাস করে।

চারিদিক থেকেই বেশ কোনঠাসা অবস্থা জামায়াতের। তবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে ফেলেছে নারীদের নিয়ে তাদের অসম্মানজনক উক্তি এবং গত দেড় বছর ধরে বিভিন্ন নারী-বিদ্বেষি কর্মকাণ্ড। জামায়াত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশের ভোটারদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী। বোরখা পরা জামায়াতের নারী বাহিনী সাধারণ নারী ভোটারদের বোঝাতে পুরোপুরি ব্যর্থ।  গোটা দেশের ৩০০টি আসনের একটিতেও নারীদের প্রার্থী না করায় জামায়াতে ইসলামী আরও বেশি করে নারীদের ক্ষোভের শিকার হয়ে উঠেছে। এখন তাই শেষবেলায় খরকুটোর মতো নারীদের প্রতি দরদ দেখাচ্ছে জামায়াত। কিন্তু এই দরদ পুরোটাই লোক দেখানো। জন্মলগ্ন থেকেই নারী স্বাধীনতার অন্ধ বিরোধী জামায়াত। ভারত বিরোধিতাও আঁতুর ঘর থেকেই তাদের রক্তে প্রবাহিত। তাই শফিকুরদের মুখের কথায় বিশ্বাস করছেন না বাংলাদেশের মানুষ।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়