বাংলাদেশে ক্ষমতা দখলের লড়াই ঘিরে ইসলামি ঐক্যে ফাটল
বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের সব ভোট ‘এক বাক্সে’ আনার স্বপ্ন শেষ। শরিয়াহ আইনের কথা বলে ক্ষমতা দখলের লড়াইতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই) থেকে শুরু করে বিভিন্ন দল জাতীয় সংসদের নির্বাচনে এক জোট হতে ব্যর্থ। ফলে ইসলামের নামে এক বাক্সে ভোট এবারের জাতীয় সংসদের নির্বাচনেও হচ্ছে না। আর সেই কারণেই ইসলামপন্থীদের জাতীয় সংসদের নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা দিন দিন আরও কমছে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জুলাই আন্দোলনের হাত ধরে জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ফের নির্বাচন বানচালের চেষ্টা পুরোদমে শুরু করে দিয়েছে। তাই ফেব্রুয়ারির ঘোষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদৌ হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় এখনও দূর হয়নি।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিয়ে এনসিপির ক্ষোভ কমার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার অভিযোগ, ইসি নিজেদের নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে ব্যর্থ। বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেছেন তিনি। তাঁর হুমকি, ‘ইসি যদি নিজেদের সংশোধন না করে, তবে প্রয়োজনে কমিশন পুনর্গঠন করে দেরিতে নির্বাচন আয়োজন করা হবে।’ একই সঙ্গে এনসিপি জানিয়েছে, ‘কোনো বিদেশি নাগরিক বা ঋণখেলাপিকে নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না।’ প্রয়োজনে ফের পথে নামার কথাও বলেছেন তিনি। আসলে জামায়াতের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনাকেই এনসিপি নেতারা প্রকাশ্যে নিয়ে আসছেন। ফুটে উঠছে তাঁদের হতাশার চিত্রও। সেই হতাশার থেকেই নির্বাচন বানচালের ভাবনাও উঠে আসছে।
জামায়াত-এনসিপির নীল নকশা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না বিএনপিরও। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাই বলেছেন, ষড়যন্ত্র করে কেউ বিএনপিকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মতোই নির্বাচন কমিশনকেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন। তারেক বলেছেন, ‘বলতে যদিও কষ্ট হচ্ছে যে আমরা দেখেছি নির্বাচন কমিশনের সম্প্রতি কিছু বিতর্কিত ভূমিকা বা বিতর্কিত অবস্থান। তারপরেও একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ধৈর্যের পরিচয় দিতে চাই’।
বাংলাদেশে মৌলবাদী রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর একক মৌরুসিপাট্টার দিন বোধহয় শেষ। জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে ঘিরে জোট রাজনীতিতেই সেই চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে গোটা বাংলাদেশেই স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি বিএনপির পক্ষে সমর্থনের বহর এখন তুঙ্গে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির সঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী জোটের কথাও বলে রেখেছেন। জামায়াতের চিন্তার বড় কারণ এককালের জোটসঙ্গী বিএনপি এবার তাঁদের বাদ দিলেও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ তিনটি ইসলামিক দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেছে। এবারের নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করা এই দলগুলো কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ভোটব্যাংকে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে জামায়াতের বিপরীতে বাড়তি সুবিধা পেতে পারে বিএনপি। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে, ততই প্রকট হচ্ছে জামায়াতের পরাজয়ের গন্ধ।
‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ ভেস্তে যাওয়ায় এখন ‘১০-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ নিয়েই নির্বাচনে লড়বে হবে ডা. শফিকুর রহমানদের। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১০-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে রয়েছে পাঁচটি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ইসলামি দল। এর বাইরে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এবং জুলাই বিপ্লবের প্রথম সারির নেতাদের নিয়ে গঠিত এনসিপি। জামায়াত ও এনসিপি সমর্থকরা বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ। মাঠ পর্যায়ে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যেও সঙ্ঘর্ষ শুরু হয়েছে। সেইসঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে জামায়াতের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে। সংখ্যালঘুদের মন পেতে কোথাও কোথাও তাঁরা নিজেদের ধর্মীয় উদারতার কথা বলছেন। আবার মুসলিম এলাকায় যথারীতি শরিয়াহ আইনের প্রচারে ব্যস্ত জামায়াত। অভিযোগ, তাঁদের উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণেই নির্বাচনের মুখে বাংলাদেশে ফের সংখ্যালঘু নিধন বেড়ে গিয়েছে। জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের লড়াইকে ঘিরে আরও বেড়ে গিয়েছে সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক।
সর্বক্ষেত্রেই জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বিরোধ এখন তুঙ্গে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার দখলের লড়াই এরজন্য দায়ী। একে অন্যকে অবশ্য শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে আক্রমণ করে নিজেদের খাঁটি ইসলামী দল বলে প্রমাণ করতে চাইছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের অভিযোগ, ‘শরিয়াহ আইন বা নীতিগত কারণে নয়, বরং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়ায় জোট ছেড়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।’
অন্যদিকে, পাল্টা আক্রমণে কার্পণ্য করছে না ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই)। তাঁরা এবারের নির্বাচনে তৃতীয় শক্তি হিসাবে উঠে আসতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। জাতীয় সংসদের নির্বাচনে জামায়াতকে বিন্দুমাত্র জমি ছাড়তে নারাজ। তৃণমূল স্তরে উভয় দলের সমর্থকরা শক্তিপরীক্ষা দিতে সঙ্ঘর্ষেও জড়িয়ে পড়ছে। শেষ মুহূর্তে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট না হওয়া প্রসঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, ‘ইসলামের মৌলিক নীতির বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর অস্পষ্ট অবস্থান ও রাজনৈতিক আস্থাহীনতার কারণে জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতায় নেই ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।’ ২৬৮ আসনে একক প্রার্থী এবং ৩২টি আসনে কৌশলী সমর্থনের মাধ্যমে তারাই দেশের বৃহত্তম ইসলামী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে চাইছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই)।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই) ছাড়ার পরেও জামায়াতের ঐক্য জোটে আসন নিয়ে বিরোধ এখনও তুঙ্গে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য ৪৭টি আসন রেখেছিল জামায়াতে ইসলামী। এখন ইসলামী আন্দোলন জোট ছেড়ে যাওয়ায় সেই আসন ভাগাভাগি নিয়ে লড়াই চলছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের দাবি, শরিকদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে এই ৪৭টি আসন। এই ৪৭টির বেশির ভাগ আসনই চায় এনসিপি। তারা মোটেই খুশি নয় মাত্র ৩০টি আসন নিয়ে। অন্তত ৫০ আসন তাঁদের চাই, বলছেন নাহিদ ইসলামরা। সবমিলিয়ে ১০ দলীয় ঐক্যজোটে ‘ঐক্য’ এখনও অধরা।



































