লন্ডনে সেমিনারে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং তা সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে আয়োজিত এক সেমিনারে। মঙ্গলবার গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্ন্যান্স—জিসিডিজির উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক অধিকার ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন দেশি-বিদেশি বক্তারা।
সেমিনারে অডিও বক্তব্য দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি তার সরকারের বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি, গণতান্ত্রিক শাসন এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশে ফিরে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও মামলার আইনানুগ তদন্ত এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়ে প্রস্তুত রয়েছেন। এসব অভিযোগের পরিণতি মোকাবিলায়ও তিনি প্রস্তুত বলে জানান।
সেমিনারে যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টির এমপি বব ব্ল্যাকম্যান নিজেকে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করে দেশটিতে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও সাংবিধানিক বিধান অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেন এবং দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার ফলে বিপুলসংখ্যক ভোটারের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন। বাংলাদেশে স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ দ্রুত ফিরে আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য পাওলো কাসাকা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করেন। তিনি দেশে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে তিনি কর্তৃত্ববাদ থেকে আরও কঠোর শাসনব্যবস্থার দিকে যাওয়ার প্রবণতা হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে দেশের জনগণ আবারও আইনের শাসন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ভিত্তিতে শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সেমিনারে ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে বক্তব্য দেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে বিভিন্ন অনিয়ম ও সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে বক্তব্য দেন। আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ছাড়া অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পরও দেশে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি বলে দাবি করেন তিনি।
সিনিয়র কলামিস্ট ও লেখক সৈয়দ বদরুল আহসান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং ১৯৭৫ সালের পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন সংকট নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষার চেয়ে তা পুনঃপ্রতিষ্ঠাই মূল চ্যালেঞ্জ। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পেছনের ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বদরুল আহসান ১৯৭২ সালের সংবিধান পূর্ণাঙ্গভাবে পুনর্বহালের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তার মতে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ভিত্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
সেমিনারের উদ্বোধনী বক্তব্যে জিসিডিজির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. হাবিবে মিল্লাত গত দুই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক কর্মী ও শিল্পীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের গ্রেপ্তার ও কারাবন্দিত্বের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে তথ্য তুলে ধরতে জিসিডিজির বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। বাংলাদেশের নাগরিকদের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান ড. মিল্লাত।
সেমিনার শেষে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়।




































