নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে জামায়াত নেতাদের মতবিরোধ তুঙ্গে
নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে জামায়াত নেতাদের মতবিরোধ তুঙ্গে
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর নেতাদের মতবিরোধ তুঙ্গে। বিভিন্ন কথাবার্তায় দলীয় নেতাদের ভিন্ন অবস্থান প্রকাশ্যে চলে আসছে। জামায়াতের মতো সুশৃঙ্খল দলের নেতাদের মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন চমকের সৃষ্টি করেছে। দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের মতবিরোধ ইসলামী দলটির তৃণমূলস্তরেও পৌঁছে গিয়েছে। জামায়াতের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বললেই টের পাওয়া যায় দলটির বিরোধ কতোটা তুঙ্গে। সম্প্রতি লন্ডনে গিয়ে ডা. শফিকুর একাত্তরে তাদের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এই ক্ষমা চাওয়ার ঘটনাটিও জামায়াতের অভ্যন্তরে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
জাতীয় নির্বাচনে দলীয় কৌশল নিয়েও দুই শীর্ষনেতার মধ্যে বিরোধ তুঙ্গে। ডা. শফিকুর মনে করেন, দেশ চালানোর ভার এখনই তাঁদের নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া ঠিক হবে না। দেশবাসীর কাছে জামায়াতের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাবে। সরকার পরিচালনার থেকে সরকারকে দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়ণে বাধ্য করার পক্ষে তিনি। অর্থাৎ অন্যের কাঁধে বন্দুক রেখে নিজেদের সংগঠনকে আরও প্রসারিত করতে চান ডা. শফিকুর। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঠিক সেই কাজটাই করছে জামায়াত ইসলামী। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় থাকলেও সরকারের আসল চাবিকাঠি আছে জামায়াতের হাতেই।
কিন্তু ডা. তাহের সেটা চান না। তিনি চান সরাসরি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে। তাঁর বিশ্বাস রাষ্ট্র পরিচালনার ভার জামায়াত পেলে কিছুদিনের মধ্যেই রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে তাঁরা জনমতকে নিজেদের পক্ষে আনতে পারবেন। সেইসঙ্গে শরিয়তের আইন প্রণনয়নও সহজসাধ্য হবে। তাই ডা. তাহের চাইছেন এবারের নির্বাচনে বেশিরভাগ আসনেই প্রার্থী দিয়ে নিজেদের হাতে ক্ষমতা তুলে নিতে। বাংলাদেশে বহুলচর্চিত পিআর বা আনুপাতিক হারে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচন নিয়েও দলের দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে বিরোধ রয়েছে।
ডা. তাহেরের যুক্তি হচ্ছে, বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে আবার তাঁদের আক্রান্ত হতে হবে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় সঙ্ঘর্ষ চলছে। বিএনপি ক্ষমতা ধরে রাখতে আওয়ামী লীগের মতোই জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতাকে ফাঁসিকাঠেও ঝোলাতে পারে বলে ডা. তাহের মনে করেন। সেইসঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে জামায়াতের কর্মীদের ওপর সংগঠিত অত্যাচারের কথা। তাই জামায়েতের নায়েবে আমির চাইছেন যেভাবেই হোক রাষ্ট্রক্ষমতা সরাসরি নিজেদের হাতে তুলে নিতে। কিন্তু আমির সেটা চান না। এই নিয়েই চলছে বিরোধ। বিরোধ এতোটাই প্রকট যে তাঁদের প্রকাশ্য বক্তৃতাতেও সেটা ধরা পড়ছে।
জামায়াতের অভ্যন্তরে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট নিয়েও বিরোধ রয়েছে। ডা. শফিকুর বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার যদি একদিনেই গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন করে সেক্ষেত্রে তাঁদের কিছু করার নেই। তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে মোটেই একমত নন জামায়াতের বেশিরভাগ নেতা। কারণ তাঁরা বুঝতে পারছেন একই দিনে নির্বাচন হলে বিএনপির জয় অবধারিত। তাই তাঁরা চাইছেন জাতীয় নির্বাচনের আগেই অন্তর্বর্তী সরকারকে গণভোটে রাজি করাতে। জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট লাগবেই বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সোজা আঙুলে যদি ঘি না উঠে, আঙুল বাঁকা করব; ঘি আমাদের লাগবেই। সুতরাং যা বোঝাতে চাই বুঝে নিন। নো হাংকি পাংকি। জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট লাগবেই। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও গণভোট করতে আইনি কোনো বাধা নেই।’
ডা. শফিকুর না চাইলেও ১১ নভেম্বর গণভোট ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ণের দাবিতে ঢাকায় জমায়েতের ডাক দিয়েছে জামায়াত। সেই জমায়েত থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারকে আরও চাপ দিতে চান জামায়াত নেতারা। তাঁদের লক্ষ্য গণভোটে পিআর পদ্ধতি পাশ করিয়ে তারপর সহজেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ দখলের মাধ্যমে নিজেদের যাত্রাপথ প্রশস্ত করেছে জামায়াত।
জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়েও বিরোধ রয়েছে জামায়াতের অভ্যন্তরে। ডা. শফিকুর মনে করেন তিনি নিজে ঢাকা থেকে জিতলেও চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ঢাকায় জামায়াত মোটেই ভালো ফল করবে না। তবে ডা. তাহেরের অনুমান গোটা বাংলাদেশেই জামায়াতের পক্ষে হাওয়া বইছে। তাই সহজেই তাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও অন্যান্য মৌলবাদী সংগঠনের সহযোগিতায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারবে। এক্ষেত্রে তাঁরা চীন ও পাকিস্তানেরও সমর্থন পাবেন।
দলের দুই শীর্ষ নেতার মধ্যেই নয়, জামায়াতের বিরোধ প্রতিটি স্তরেই দানা বাঁধছে। জামায়াতে ইসলামির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সম্প্রতি বলেছেন, নির্বাচনের আগে গণভোট করতে হবে। প্রয়োজনে নির্বাচন দুমাস পরে হবে। কিন্তু তাঁদের দলেরই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন চাই। তাঁর মতে, এখনই জাতীয় নির্বাচন হলে সরকার গঠন সহজ হবে জামায়াতের। কিন্তু গণভোটকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন পরওয়ার।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের ‘হাতের পুতুল’ বলে পরিচিতি জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মধ্যেও শুরু হয়েছে জামায়াতের সঙ্গে জোট করা নিয়ে দ্বন্দ্ব। এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারি জানিয়েছিলেন, জাতীয় সংসদের আসন্ন নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট করতে পারেন তাঁরা। আবার তাঁদের দলেরই আহ্বায় নাহিদ ইসলাম বলেছেন, জাতীয় সংসদের নির্বাচনে অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাঁরা সমঝোতা করবেন না। জামায়াতের ভিতরেও এনসিপি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। সবমিলিয়ে বিরোধ বাড়ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে। বাড়ছে উত্তেজনাও।





































