নদীর পানি সমস্যার সমাধানে একমাত্র পথ আলোচনা
ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন যৌথ নদীগুলোর পানি সমস্যা মেটাতে আলোচনাই একমাত্র পথ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন আলোচনার মাধ্যমেই দীর্ঘদিনের এই সমস্যার জট কাটতে পারে। দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান দ্বিপাক্ষিক স্তরেই মিটবে। আলোচনার মাধ্যমে অতীতে আমরা বহু বড় বড় সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছি। তাই তিস্তা বা গঙ্গার পানি নিয়েও সমস্যার সমাধানে সরকার আত্মবিশ্বাসী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ভারতের তার প্রথম সরকারি সফরেই বলেছিলেন, ‘ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিটি হবে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য প্রথম পরীক্ষা’। চলতি বছরেই সেই পরীক্ষার ফল মিলতে পারে।
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও পদ্মাসহ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন যৌথ নদী রয়েছে। নদীগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) । তবে ৮টি নদীর পানি ভাগাভাগির ব্যাপারে এখনও কোনো সুরাহা হয়নি। ৬টি নদীর পানি বণ্টনে একটি কাঠামো চুক্তি কীভাবে করা যায়, সে ব্যাপারে আলোচনা চলছে। এই নদীগুলো হচ্ছে, মনু ও মুহুরি, খোয়াই, গোমতী, ধরলা ও দুধকুমার। উভয় দেশই সেচ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পানি ভাগাভাগির মতো বিষয়গুলো নিয়ে বহুদিন ধরেই আলাপচারিতা চালাচ্ছে।
ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ নদীগুলোর সমস্যা সমাধান ও কারিগরি সহযোগিতার জন্য ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ জেআরসি গঠিত হয়। জেআরসির বয়স ৫০ বছরেরও বেশি। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই কমিশন গঠনে উদ্যোগী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে উভয় দেশেই সরকার বদল হলেও জেআরসির ভূমিকা রয়ে গিয়েছে এক। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে স্বাক্ষরিত হয় গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছে প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানির প্রবাহের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে উভয় দেশ আনুপাতিক হারে পানি পাবে। চুক্তিতে সংকটকালীন বা স্বল্প প্রবাহের সময়ে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় ৩৫ হাজার কিউসেক পানি প্রাপ্তির একটি নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী চলতি বছরেই ফের চুক্তির নবায়ণ জরুরি হয়ে উঠেছে।
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সম্প্রতি পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী জানিয়েছেন যে, সরকার এ বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। তিনিও আশা প্রকাশ করেছেন, আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানসূত্র বার হবে। তার কথায়, ‘আমরা আশা করছি দুই দেশের বিশেষজ্ঞ কমিটি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসবে। এরপর মন্ত্রীপর্যায়ে জেআরসির বৈঠকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে বলে আশা করছি’। পানির বিষয়টি বেশ স্পর্শকাতর। কারণ বাংলাদেশের মানুষের শুধু রুটি-রুজি নয়, বেঁচে থাকার অধিকারও প্রবাহিত হয় নদীর পানি প্রবাহের ওপর। নদীমাতৃক বাংলাদেশে খরা ও বন্যায় প্রতি বছর প্রচুর প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে। ভারতেও নদীর পানির ওপর লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা নির্ভরশীল। অথচ, নদীর নব্যতা দিন দিন কমছে। তাই কমছে পানির প্রবাহও।
গত মাসে ভারতের কলকাতা শহরে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) ৯০তম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে উভয় দেশের নদী বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করলেও সাংবাদিকদের সামনে কেউ মুখ খোলেননি। কারণ তারা চাননি নতুন করে কোনও বিতর্ক হোক। উভয় দেশের প্রতিনিধিরাই চাইছেন সুষ্ঠু সমাধান। তার ফরাক্কা ব্যারাজও পরিদর্শন করেন। সেখানেও গোপনীয়তা রক্ষা করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে চুক্তিটি পুনর্নবায়ন ও এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা বৈঠকে বসেছিলেন। তখনও ফারাক্কায় গঙ্গার পানিপ্রবাহের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে দুই দিন ধরে সরেজমিনে জরিপ করেছিলেন দুই দেশের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা। জেআরসির সদস্যরা ফরাক্কা চুক্তির নবীকরণ নিয়ে বাস্তব জমিতে দাঁড়িয়ে উভয় রাষ্ট্রের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে কাজ করছে।
ফরাক্কা চুক্তির নবীকরণ জরুরি। তবে সেটা অতীতের প্রেক্ষাপটে সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করেই আলোচনার মাধ্যমে সেটি করতে হবে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাই কমিশনার পঙ্কজ শরণের মতে, ১৯৯৬ সালের চুক্তির ত্রিশ বছর পর এসে একই শর্তে কাজ করতে পারে না। তিনি এ ক্ষেত্রে গত ৪০ বছরের পানি প্রবাহকে ভিত্তি হিসেবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন। আবার বাংলাদেশে যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য ও নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করতে হবে। তবে তিনি ফরাক্কার পানি প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে পানি বন্টনে রাজি নন। তার মতে, ফরাক্কায় পৌঁছানোর বহু আগে গঙ্গার উৎপত্তি। তাই সবদিক বিবেচনা করেই ফরাক্কার পানি বন্টন করতে হবে।
সবদিক বিবেচনা করে দ্রুততার সঙ্গে আলোচনা চলছে। কারণ ১৯৯৬ সালে গঙ্গার পানির সুষ্ঠু বণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছিল, তার মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর। ইতিমধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে যৌথ নদী কমিশনের শেষ বৈঠক। ভারত থেকে বেশির ভাগ নদী প্রবাহিত হলেও বাংলাদেশকে দিতে হবে তার ন্যায্য পাওনা। প্রতিবেশী বন্ধু দেশকে কিছুতেই বিপদে ফেলা ভারতের পক্ষে শোভনীয় নয়। সম্পর্কের ঐতিহাসিক ও মানবিক ভিত্তিকে মাথায় রাখতে হবে দিল্লিকে। আর বাংলাদেশকেও মনে রাখতে হবে অযৌক্তিক দাবি তুলে নিজেদের সম্পর্ককে শুধু পানি জটে আটকে রাখলে আসলে ভুগতে হবে দেশবাসীকেই।
শুধু গঙ্গা নয়, অন্যান্য নদী নিয়েও কাজ করতে হবে দুই দেশকে। বিশেষ করে তিস্তা সমস্যার জট দ্রুত কাটাতে হবে। ২০১১ সালেই দু'দেশের মধ্যে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে ঢাকা ও দিল্লি সম্মত হয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সক্রিয় বিরোধিতায় পিছু হঠতে বাধ্য হন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ থেকে মমতা ব্যানার্জি ও তার দল তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন বিজেপিরই শুভেন্দু অধিকারী। কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের সরকার হওয়ায় তিস্তা সমস্যা সমাধান আরও সহজ হবে। এছাড়াও তিস্তা মহাপ্রকল্প রূপায়ণে ভারতের আগ্রহের বিষয়টিও বাংলাদেশ বিবেচনা করতে পারে।
তবে বর্তমানে ভারত ও বাংলাদেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে ব্রহ্মপুত্র। কারণ চীন ইয়ারলুং সাংসপো নদীতে দৈত্যাকারের বাঁধ নির্মাণ করছে। এই ইয়ালরুম সাংসপোই তিব্বত থেকে ভারতে ঢুকে আসাম রাজ্যে ব্রহ্মপুত্র আর বাংলাদেশে যমুনা নাম নিয়ে পদ্মা হয় বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। বাঁধটি নির্মিত হলে গ্রীষ্মে পানির পরিমান কমবে এবং মারাত্মক ক্ষতি হবে কৃষির। আর বর্ষায় উজানের পানি ভাসাবে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এর হাত থেকে বাঁচতেও জরুরি ভারতের সঙ্গে এখন থেকেই সতর্কতামূলক আলোচনা। আলোচনার মাধ্যমেই একমাত্র মিলতে পারে সমস্ত পানি সমস্যার সমাধানসূত্র





































