শুক্রবার , ১৯ জুন ২০২৬
Friday , 19 June 2026
২০২৬৭ ২০২৬৩ ২০২৬১

জাতীয়

প্রকাশিত: ১৬:৫৭, ১৮ জুন ২০২৬

সামরিক খাতে তুর্কি বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশে

সামরিক খাতে তুর্কি বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশে

তুরস্ক বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চায়। খুব ভালো কথা। বিদেশি বিনিয়োগ দেশের উন্নয়নের জন্য জরুরি। কিন্তু সামরিক খাতে বিনিয়োগে তুরস্কের বাড়তি উৎসাহ সন্দেহজনক। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে চিকিৎসা, জ্বালানি, বিদ্যুৎ প্রভৃতি ক্ষেত্রে তুর্কি বিনিয়োগ স্বাগত। বাংলাদেশের সামরিক শক্তির থেকে বেশি জরুরি মানবিক শক্তির বিকাশ। অনেকেই মনে করেন, যুদ্ধ নয়, উন্নয়নে চাই ড্রোন। দেশের জনগণের সার্বিক কল্যাণের দিকটি মাথায় রাখতে হবে সর্বাগ্রে।

 

এটা ঠিক তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সখ্যতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি হবে। রয়েছে আর্থিক উন্নয়নেরও সম্ভাবনাও। কারণ তুরস্ক বাংলাদেশের মাটিতেই গড়ে তুলতে চায় প্রতিরক্ষার জন্য ড্রোন এবং আনম্যানড কম্যাট এরিয়াল ভেহিকেল (ইউসিএভি) নির্মাণ কারখানা। এরজন্য তারা ২.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। তাই তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফর অনেককেই খুশি করেছে। কারণ তার এই সফরের হাত ধরে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা খাতেই বিনিয়োগের বাড়তি উৎসাহ সন্দেহজনক। বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের আগেই সেদেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের নির্মাণখাত, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিখাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছিলেন। গত এপ্রিলে তিনি তুর্কি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে তুরস্কের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে চায়। সরকার সেই লক্ষ্যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে’। তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরেও ঠিক হয়েছে বাংলাদেশ সরকার তুরস্ককে সুপার স্পেশাল হাসপাতাল ও নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলে জায়গা ও সুযোগ সুবিধা প্রদান করবে।

 

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিচেপ তায়িপ এর্ডোগানের বিশেষ দূত হিসাবেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ঢাকা সফর করেন। তুরস্ক আগামী ৪ বছরে ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করতে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান বাজারগুলোতে পরিষেবা প্রদানের জন্য ঢাকার কাছে ড্রোন ও ইউসিএভি উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে ২.৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। তারা বাংলাদেশে তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ‘বের‌্যাকটার টিবি-২’ আর সোনগার ড্রোন তৈরি করবে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি কতোটা জরুরি সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের সখ্যতও যথেষ্ট সন্দেহজনক।

 

অতিরিক্ত চীন ও পাকিস্তান নির্ভরতায় বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এখন দুর্বল করে তুলেছে। চীনের অস্ত্র ও যুদ্ধবিমান মোটেই আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য কার্যকর নয়। তাদের খেলনার মতোই চীনা অস্ত্রও সহজেই বিকল হয়। চীনা প্রযুক্তিতে পাকিস্তানি সরঞ্জাম আরও খারাপ। আবার যুক্তরাষ্ট্র বা ইওরোপের দেশগুলোতে সামরিক সরঞ্জামের দাম অনেক বেশি। এই পরিস্থিতির ফায়দা নিতেই এগিয়ে এসেছে তুরস্ক। সেই বিক্রিরই কৌশল নয়তো এই বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি? প্রশ্ন উঠছে, তুরস্ক ড্রোন তৈরির কারখানা বানানোর নামে নিজেদের দেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ এখানে শুধু অ্যাসেম্বেল করবে না তো? তারা কি সত্যিই উৎপাদনমুখী শিল্প গড়তে চায়? নাকি কর ফাঁকি দেওয়ার কোনও ছক কষছে? দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে সমঝোতা করে তুরস্কের ড্রোন ও ইউএসিভি তৈরির কারখানা গড়ে তোলা কিন্তু যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে।

 

তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ে যৌথ কমিটি গঠন করা হবে। এই কমিটি গঠনের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত সমাধান করে দ্রুত সামরিক শিল্প স্থাপনে সক্ষম হবে দুই দেশে। ঠিক হয়েছে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছরই 'টু প্লাস টু' (২+২) পরামর্শ বৈঠক আয়োজন করা হবে। সেখানেই আলোচিত হবে নতুন নতুন পরিকল্পনার। সেইসঙ্গে পরিকল্পনা বাস্তবায়ণও উভয় দেশ মনিটর করতে পারবে। ভালো কথা। কিন্তু নিজেদের দেশের স্বার্থও সুরক্ষিত রাখতে হবে। খতিয়ে দেখতে হবে আমাদের দেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির নামে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ কতোটা যুক্তিসঙ্গত।

 

পাকিস্তান বা চীনা প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি টেকসই তুর্কি সমরাস্ত্র। ২০২২ সালে ড্রোন সংগ্রহ নিয়ে তুরস্কের কোম্পানির সাথে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর চুক্তিটিও ছিল ড্রোন আমদানির। এখন বলা হচ্ছে বাংলাদেশেই ড্রোন নির্মিত হবে। সেই ড্রোন বাংলাদেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হবে অন্য দেশে। আসবে বৈদেশিক অর্থ। কিন্তু সেটা কতোটা বাস্তব সম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য দুশো কোটি ডলারের উন্নীত করতে চান তারা। আর সেই কারণেই তিনি প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন। আসলে তাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশে অস্ত্র বিক্রি। তুরস্ক এখন বিশ্বের ১৪তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তারা নিয়েছে নতুন এই কৌশল।

 

বাংলাদেশ সরকার তুরস্কের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন বা উন্নয়নে তুরস্ককে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও গার্মেন্ট সেক্টরেও তুরস্ক কাজ করতে পারে। বিনিয়োগের বহু ক্ষেত্র এখনও অধরা রয়েছে। কিন্তু সেইসব ছেড়ে অস্ত্র তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগে উৎসাহ সন্দেহ তৈরির পক্ষে যথেষ্ট। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ সামরিক দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিশালী। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিন্দুমাত্র হুমকির সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতেও নেই বলেই কূটনৈতিকমহল মনে করে। এমন পরিস্থিতিতে ছায়াযুদ্ধের প্রস্তুতি দেশের আর্থিক শক্তিকে দুর্বল করার পক্ষে যথেষ্ট।

 

তুরস্কের অস্ত্র হতে পারে যথেষ্ট টেকসই। কিন্তু আমাদের প্রয়োজন কতোটা সেটাও তো ভেবে দেখতে হবে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, ‘চীনা অস্ত্র বাজার থেকে নির্ভরতা কমানোর চিন্তা হলেও মার্কিন ও ইউরোপের অস্ত্রের দাম বেশি। সেই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের সাথে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগটি ইতিবাচক’। সামরিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলামও বলছেন, ‘তুরস্কের ড্রোন ও ট্যাংকের সক্ষমতা এখন প্রমাণিত এবং একই সাথে খরচ কম কিন্তু সক্ষমতা বেশি এমন সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে তুরস্ক ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে’।

বাংলাদেশ তুরস্ক থেকে মাইন সুরক্ষিত সামরিক যান ও বহুমাত্রিক রকেট প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহ করেছে। এছাড়াও তুরস্ক থেকে গ্রাউন্ড সার্ভেইলেন্স রাডার, সাঁজোয়া যান, পোর্টেবল জ্যামার, মিসাইল লঞ্চিং সিস্টেম, স্কাইগার্ড রাডার সিস্টেমসহ নানা ধরনের সমরাস্ত্র কেনা হয়েছে। অস্ত্রের গুণগত মান নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। ফ্যাসিবাদী সরকার এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কারণে দেশের বেহাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অস্ত্র কেনাকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া কতোটা যৌক্তিক সেটা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা তুরস্কের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য স্বাক্ষরের সম্ভাবনার বিষয়ে আলোকপাত করেছি। আমরা একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেছি।’

 

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী ‘বাণিজ্য ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ— উভয় ক্ষেত্রেই তুরস্ক বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্ভাবনা ও পারস্পরিক মিল বিবেচনায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের পরিমাণ আরও বাড়ার সুযোগ রয়েছে’। বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস সেন বলেছেন, ‘দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতের পারস্পরিক সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে’।

 

বিনিয়োগ চিরকালই স্বাগত। উন্নয়নের স্বার্থেই জরুরি বিদেশি বিনিয়োগ। কিন্তু সেই বিনিয়োগের হাত ধরে যুদ্ধ যুদ্ধ জিগির তোলা কতোটা যুক্তিসঙ্গত তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। প্রশ্ন উঠবে, বাংলাদেশের মানবিক সম্পদের বিকাশের বদলে সামরিক শক্তির বিকাশে বেশি আগ্রহের কারণ নিয়েও। দেশের সার্বভৌমত্বের স্বার্থেও বিদেশি শক্তির সঙ্গে সামরিক সখ্যতা বজায়ের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।

সর্বশেষ

জনপ্রিয়