বহুপাক্ষিক দুনিয়ায় ভারসাম্যের কূটনীতিতে বিশ্বগুরু ভারত
ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’। অর্থাৎ ‘এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ’। এই নীতিকেই কাজে লাগিয়ে অস্থির বিশ্বে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারত সকলকে সঙ্গে নিয়ে চলার নতুন দিশা দেখাচ্ছে। কোনও এক পক্ষের সঙ্গে নয়, সার্বিক ভাবে সকলের সঙ্গে থেকেই মানুষের মুখে ভারত হয়ে উঠেছে ‘বিশ্বগুরু’। ভারসাম্যের কূটনীতিকে ভর করে ভারত এখন সকলের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শীর্ষ সম্মেলন বা এআই সামিট এবং রাইসিনা সংলাপ-এ উপস্থিত দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ ভারতের এই পররাষ্ট্র নীতির ভূয়সি প্রশংসা করেছে। ভারত এখন শুধু আর দক্ষিণ এশিয়ার নয়, গোটা দুনিয়ার কাছেই এক বড় শক্তি এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসাবে প্রশংসিত।
অর্থনীতিবিদদের অনুমান, ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারত আত্মনির্ভর রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে মোদী সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের রেটিং এজেন্সি মুডিসের জরিপে উঠে এসেছে জি-২০ দেশগুলির মধ্যে সবথেকে দ্রুত গতিতে দৌড়চ্ছে ভারতের আর্থিক বিকাশ। তাদের অনুমান, ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতি ৬.৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। বহুপাক্ষিক বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত এখন প্রতিবেশীদের তো বটেই, দুনিয়ার বহু উন্নত দেশেরও ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার’। যুক্তরাষ্ট্র বা চীন, কারও পক্ষে বা বিপক্ষে না গিয়ে সকলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ভারত। পরিবর্তীত বিশ্বে বহুমুখী কূটনীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সাংস্কৃতিক প্রভাব ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা সংস্থা ‘মর্নিং কনসাল্ট’-এর গ্লোবাল লিডার অ্যাপ্রুভাল ট্র্যাকার-এর জরিপে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ভারত তার অগ্রগতির ক্ষেত্রে হাতিয়ার করেছে আত্মনির্ভরতাকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্লোগান, ‘আত্মনির্ভর ভারত’ আজ বাস্তব চেহারা নিচ্ছে। এই আত্মনির্ভরতার জন্যই ভারত বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে। গত বছর দেশের সর্বস্তরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পৌঁছে দিতে ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল মোদী সরকার। চলতি বছরে দেশের প্রাণকেন্দ্র ও বড় বড় শহরগুলি এআই হাব তৈরির জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
চলতি বছরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হল এআই সামিট। অংশ নেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ-সহ একাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা। ছিলেন বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার কর্তারাও। ভারত সফরে এসে মাক্রোঁ উচ্চসিত প্রশংসা করেন দেশটির সার্বিক উন্নতির। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অংশগ্রহণ প্রশংসিত হয় এআই সামিটে। প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, ‘সকলের ভালো এবং সকলের আনন্দ আমাদের লক্ষ্যমাত্রা। মানুষ কেবল এআই-এর তথ্যভান্ডার হবে না। মানবতার উন্নয়নে ভারতের ‘মানব’ দৃষ্টিভঙ্গি একবিংশ শতকের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’। ভারতের রেল ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আমরা একটাই পর্ব দেখেছি। কিন্তু এআই-এর ব্যাপকতা আরও অনেক বেশি। আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়াররা ইতিমধ্যে এআই-এর বিকাশে নানা পরীক্ষামূলক কাজ করছে। খুব শীঘ্রই আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিশ্বগুরু হয়ে উঠব।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রহ্মমণিয়াম জয়শঙ্করের মতে, ভারত তার সার্বিক বিকাশকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখে। সদ্য সমাপ্ত রাইসিনা সংলাপে সেই পররাষ্ট্র নীতিরই প্রশংসা শোনা গেল বিশ্বনেতাদের কাছে। এবারের একাদশতম রাইসিনা সংলাপে অংশ নিয়েছিলেন ১১০টি দেশের প্রায় ২৭০০ জন প্রতিনিধি। মূল ভাবনা ছিল, ‘সংস্কৃতি - দাবি, বাসস্থান, অগ্রগতি’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ফিনল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি আলেকজান্ডার স্টাব। তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করে তার কূটনৈতিক দক্ষতাকে সাধুবাদ জানান। একই বক্তব্য শোনা গিয়েছে ভুটান, মরিশাস, মাল্টা, সেশেলস এবং শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের গলাতেও।
রাইসিনা সংলাপের পাশাপাশি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত চতুর্দেশীয় অক্ষ বা ‘কোয়াড’-এও প্রশংসিত হয়েছে দিল্লির পররাষ্ট্র নীতি। ভারতের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান, বৃহৎ জনসংখ্যা, দ্রুত বর্ধমান অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তাকে বিশ্ব মঞ্চে একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের ভূমিকা ক্রমবর্ধমান, যেখানে সে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে।
রাশিয়া এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র বা ইওরোপ যে ভালো চোখে দেখে না সেটা দিল্লি ভালোই বোঝে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অতি বন্ধুত্ব রাশিয়া বা চীন যে ভালো চোখে দেখে না সেটাও অজানা নয় দিল্লির। তাই কূটনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখাটাই হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি। আর সেই জরুরি কাজটাই দক্ষতার সঙ্গে করে চলেছে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রক। জি-২০ শীর্ষ বৈঠকের সফল আয়োজনই শুধু নয়, নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমেও ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে বহুপাক্ষিক পররাষ্ট্র নীতি থেকে পিছু হঠবে না তাঁরা। সকলের সঙ্গেই বন্ধুত্ব রেখে চলতে চায় দিল্লি। ভারতের এই অবস্থান প্রশংসিতও হচ্ছে গোটা দুনিয়ায়।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা মোদী সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেছেন, আগামী দশ বছরে ভারত ও ব্রাজিলের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। সম্প্রতি মাত্র দুই ঘণ্টার সফরে দিল্লিতে পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করে আবু ধাবির প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সম্পর্কে আরও উষ্ণতা যোগ করেন। আবার পশ্চিম এশিয়ায় এই যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘নিরাপত্তা সংক্রান্ত হুমকির জটিলতা গোটা বিশ্বে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও দ্রুত বদল আসছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্ক আরও নিবিড় হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছে তারা’। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ক্রমবর্ধমান জটিল এবং অনিশ্চিত আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, ভারতের সঙ্গে একটি শক্তিশালী, স্থিতিস্থাপক এবং দূরদর্শীমূলক অংশীদারিত্বের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
ভারত তার পররাষ্ট্র নীতির জন্য গোটা দুনিয়াতেই সমাদৃত। প্রতিবেশী বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় শুভেচ্ছা জানাতে সংসদের স্পিকার ওম বিরলাকে ঢাকা পাঠাতে ভুল করেনি দিল্লি। শুধু তাই নয়, প্রতিবেশী দেশটিতে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দিতেই অতিরিক্ত ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাঠাওতে দেরি করেনি। নেপালের মানুষ বালেন্দ্র শাহকে নির্বাচিত করতেই শুভেচ্ছা জানিয়েছে ভারত।
নিরপেক্ষ অবস্থানের জন্য দেশে দেশে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর খাতিরদারিও বাড়ছে। ২০২৩ সালে ফ্রান্সে বাস্তিল দিবসের প্যারেডে অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। মরিশাসের জাতীয় দিবসে প্রধান অতিথি ছিলেন দুবার। ২০২২ সালে বুদ্ধ জয়ন্তী উপলক্ষে নেপালের লুম্বিনিতে অতিথি ছিলেন মোদী। ২০২১ সালে বাংলাদেশের ৫০ তম স্বাধীনতা দিবসেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। নিরপেক্ষ অবস্থানের জন্যই গোটা দুনিয়ায় শান্তির দূত হিসাবে সমাদৃত নরেন্দ্র মোদীর ভারত। বিশ্বনাগরিকরাই বলছেন ‘বিশ্বগুরু’।



































